শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৬

গণমাধ্যমে জীবনের প্রতিফলন


আমরা গণমাধ্যমে যা দেখি, শুনি বা পড়ি তা সবই একটি জাতির সংস্কৃতির প্রকাশ্য রূপ। মাধ্যম বলতে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, কম্পিউটার, রেডিও, মঞ্চ, পত্র-পত্রিকা, ভিসিডি, ক্যাসেট, বই-পুস্তক, ম্যাগাজিন সবই বুঝায়। আর এসবের মাধ্যমে যে সংস্কৃতির যোগান দেয়া হয় তার উপস্থাপনা একজন লেখকের চিন্তা প্রসূত এবং বেশিরভাগই গল্পকেন্দ্রিক।
অনেক বিদেশি টিভি চ্যানেল খবর পড়ার মধ্যেই একটা বিশেষ খবরকে বিশ্বাসযোগ্য, রসময় ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলার জন্য গল্প দেখানোর মতো করে দেখায়। বাস্তব জীবনেও আমরা গল্প শুনতে ও বলতে ভালোবাসি।
অফিস থেকে ফিরে কেউ অফিসের গল্প বলে, দেশের বাড়ি থেকে ফিরে এসে প্রায় লোকই দেশের গল্প বলে। ছাত্ররা ছুটিতে বাড়ি গিয়ে কলেজ-ভার্সিটি এবং হোস্টেল বা মেসের গল্প বলে। দেশের বাড়ির কোনো আত্মীয় এলে মানুষ তার কাছে দেশের নানান গল্প শুনতে চায়। চিড়িয়াখানা, যাদুঘর বা সংসদ ভবনে কেউ গেলে বাড়ির লোক বা বন্ধুরা সেখানকার গল্প শোনার বায়না ধরে।
ছোটবেলায় বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানীর কাছে গল্প শুনতে চায়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বিদেশ থেকে কেউ এলে তার কাছে বিদেশের গল্প শোনার জন্যেতো রীতিমতো ভিড় লেগে যায়। মোটকথা মানুষ সদা-সর্বদা কোনো না কোনোভাবে গল্প বলছে এবং শুনছে।
রসিয়ে রসিয়ে একটা সামান্য ঘটনাও কেউ কেউ এমনভাবে বলতে পারে যে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শোনে। আর রসিয়ে গল্প বলার জন্য ব্যক্তির একটা বিশেষ জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় পরিচিত মহলে। গল্পের মাধ্যমে যেসব ঘটনা এবং বিষয়বস্তুর প্রকাশ ঘটে তা থেকে আনন্দের সঙ্গে মানুষ শিা, বৈধ-অবৈধ কর্মকাণ্ডের স্বরূপ এবং লাভ-তির দিকগুলো ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।
আর এই গল্প চলচ্চিত্র তথা মিডিয়ার মূল উপাদান। সাহিত্য, কাব্য, সংগীতের মূল উপাদানও গল্প। কোথাও তা মূর্ত কোথাও তা বিমূর্ত, কোথাও তা মুখ্য কোথাও তা গৌণ, কোথাও তা প্রত্য কোথাও তা পরো।
টিভি, রেডিও, পত্র-পত্রিকায় যেসব সাাৎকার, আলোচনা, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আমরা দেখি সেসব অনুষ্ঠানের নেপথ্যে একজন লেখক সত্তার চিন্তা-ভাবনা সক্রিয় থাকে।
বিংশ শতাব্দির সূচনাতেই চলচ্চিত্রের আগমন (এরপর পর্যায়ক্রমে টিভি, রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার, ভিডিও  কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন এসেছে)। আর এসব মাধ্যম আজ সমাজ-সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যতম অনুষঙ্গ।
এসব মাধ্যমে মানুষ তার মনের চাহিদার প্রতিফলন দেখতে আগ্রহী। আজকের যুগে প্রায় প্রতিটি মানুষই গল্প (খবর, ইতিহাস, জীবনাচারণ, বক্তব্য, দেশ-বিদেশের প্রকৃতি … ইত্যাদি) পড়ার চেয়ে বা শোনার চেয়ে দেখার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। এজন্য প্রকাশনার মাধ্যমটির সাথে যারা ব্যবসায়িকভাবে জড়িত, তারা তাদের ব্যবসা নিয়ে চিন্তিত। আর প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে যারা লেখক হিসেবে জড়িত তারা বেশিরভাগই দর্শনযোগ্য অর্থাৎ মিডিয়ার লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে আগ্রহী।
এখনতো দশ সেকেন্ডের একটা বিজ্ঞাপনচিত্রও গল্পভিত্তিক হয়ে গেছে। হয়তো সামনে এমন দিন আসবে যে বক্তারা কষ্ট করে আর জনসভায় না গিয়ে তাদের বক্তব্য কম্পিউটার ও ভিসিডির মাধ্যমে বাজারজাত করবেন। আর তার পেছনেও থাকবে একজন লেখকের সক্রিয় ভূমিকা।
তাই এই মুহূর্তে চলচ্চিত্র, টিভি, ভিসিডি, ক্যাসেট, মঞ্চ ইত্যাদির জন্য লেখালেখির কর্মটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখার কাজটি গদ্যসাহিত্য, কাব্য বা সংগীতের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ প্রথমে লেখার কাজ তারপর চিত্রনাট্য তারপর চলচ্চিত্র…এই হলো চলচ্চিত্রের সংপ্তি ও সামগ্রিক রূপরেখা। আর ক্যামেরা হলো চলচ্চিত্রের বাহন।
লেখার পরের কাজগুলি সবই টেকনিক্যাল, আমি শুধুমাত্র লেখালেখি করার জন্য যে প্রস্তুতি, এই প্রবন্ধে সেই বিষয়েই আলোচনা করছি বিধায় তারই মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার চেষ্টা করবো। আমরা সিনেমা, টিভি এবং কম্পিউটারের পর্দায় যা কিছুই দেখি তা সবই চলচ্চিত্র। বিষয়বস্তু, বক্তব্য, সময়সীমা, উপস্থাপনা ও সামগ্রিক আঙ্গিকের বিচারে এসবের শ্রেণীভাগ করা হয়েছে। যেমন পূর্ণ দৈর্ঘ চলচ্চিত্র, স্বল্প দৈর্ঘ চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র, বিজ্ঞাপন চিত্র, সংবাদচিত্র, টেলিফিল্ম, প্যাকেজ নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি। আবার সংস্কৃতি সংক্রান্ত এসব মাধ্যমগুলোকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে :
১. শব্দজনিত : ভাষা (সংলাপ), নৃত্য, সংগীত, নাট্যকলা ইত্যাদি।
২. টেকনিক্যাল : বই পুস্তক মুদ্রণ, সংবাদপত্র, রেডিও, ভিসিডি ক্যাসেট (কারিগরিক মাধ্যম) ইত্যাদি।
৩. ছবি ও শব্দ তরঙ্গজনিত বৈজ্ঞানিক মধ্যম : কম্পিউটার, টিভি ও চলচ্চিত্র। এই মাধ্যমগুলির প্রাণকেন্দ্র হলো চলচ্চিত্র।
একমাত্র চলচ্চিত্রের গর্ভেই উক্ত সকল মাধ্যমগুলোর আবাসস্থল। অতএব, একমাত্র চলচ্চিত্রের জন্য লেখার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারলে বাকি বিষয়গুলোর জন্য লেখা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে চলচ্চিত্রের লেখালেখির কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম বা পদ্ধতি নেই। শুধু মাত্র নিম্নের গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে পারলে চলচ্চিত্রের জন্য লেখালেখি করা সম্ভব। এই চারটিই একজন লেখকের জন্য মৌলিক গুণ বা বৈশিষ্ট্য।
১. সাহিত্যবোধ
প্রচুর লেখাপড়া করতে হবে। ভালো সাহিত্য ভালো সাহিত্যবোধ তৈরি করে। অন্যান্য শিার জন্য ইতিহাস, ভূ-গোল, ভ্রমণকাহিনী, জীবনকাহিনী, রাজনীতি বিষয়ক পুস্তকাদি পড়া উচিত। বিশ্বের বিভিন্ন জনপদ, তাদের জীবনাচারণ, পেশা এবং মানুষ ও প্রকৃতি সম্বন্ধে ধারণা অর্জন করতে হবে। আর এসব জ্ঞান থেকে সুস্থ রুচিবোধ আয়ত্ত করা কর্তব্য।
২. চলচ্চিত্রবোধ
ভালো ভালো ছবি দেখতে হবে। সাধারণ দর্শকের আবেগী দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা নিয়ে ছবিগুলোর পরিবেশ, প্রকৃতি, চরিত্র, সংলাপ, চরিত্রের আচার-আচরণ ও নৈতিকবোধ দেখতে হবে। চলচ্চিত্র বিষয়ে রচনা পড়তে হবে।
৩. বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি
নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষণের মতা অর্জন করতে হবে। একজন যুক্তিবাদী প্রবন্ধকারের দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করতে হবে।
৪. মনস্তত্ত্ব
মানুষের অভিব্যক্তি, বিশেষ করে মানুষের দৃষ্টিপাতের অর্থ, মুখ ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির অভিব্যক্তি দেখে তার মানসিক অবস্থা নির্ণয় ও পছন্দ-অপছন্দ অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। একজন লেখকের জন্য মনস্তত্ত্ব অধ্যয়ন ও চর্চা করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
উক্ত চারটি মৌলিক বিষয় সম্বন্ধে চর্চা করা এবং জ্ঞান অর্জন করতে পারলেই যে ভালো লেখক হওয়া যাবে তা নয়। তবে লেখক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইলে উক্ত বিষয়গুলো আয়ত্তে থাকা চাই। এরপর অনুশীলন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়েই ক্রমে ক্রমে চলচ্চিত্রের লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
উক্ত চারটি বিষয়ে একজন লেখককে লেখালেখি করার প্রধান প্রধান চারটি বৈশিষ্ট্যের দিকে ধাবিত করে : ১. পরিবেশ সৃষ্টি ২. চরিত্র সৃষ্টি ৩. অপ্রধান ঘটনার সঙ্গে প্রধান ঘটনার সংযোগ স্থাপন এবং ৪. খণ্ড খণ্ড পরস্পর বিযুক্ত বিষয়কে প্রধানত পরস্পরের সাহায্যে একটি অর্থসূত্রে গেঁথে তোলা।
চিত্রনাট্য রচনা ও সম্পাদনার কাজেও উক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য সমভাবে প্রযোজ্য। এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মী কি উক্ত গুণ বা বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে পারলে লেখক হিসেবে তার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হবে? এর জবাব এক কথায় ‘না’। তাকে আরো কিছু অর্জন করতে হবে। কারণ একটা বিশেষ কিছু করতে গেলে বিশেষ কিছু জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা-ভাবনা, মূল্যমান এবং ল্য ও উদ্দেশ্য থাকতে হবে। বিশেষ কিছু আকিদা বিশ্বাসকে ধারণ করতে হবে, তাকে ভিত্তি করতে হবে।
ইসলাম একটি বিশেষ জীবনব্যবস্থা, একটি বিশেষ আদর্শ। এই বিশেষ আদর্শকে ভিত্তি করে যখন কেউ কোনো কর্মকাণ্ড রপ্ত করতে চাইবে তখন অবশ্যই তাকে উক্ত আদর্শ প্রসঙ্গে ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে হবে। কর্মের স্বরূপ হিসেবে ইসলামের নানামুখি শিা বিদ্যমান।
যেহেতু কর্মটি গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমের জন্য লেখালেখি সেহেতু নিজেকে লেখক হিসেবে প্রস্তুত করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করা বাঞ্ছনীয়।
সূর্যের আলো ও রাতের কৃত্রিম আলোর মধ্যে বিস্তর তফাৎ। শুধুমাত্র ইসলামকে জেনে বুঝে গণমাধ্যমের জন্য কিছু রচনা করা, রাতের কৃত্রিম আলোর মতো। তা দিয়ে ব্যক্তি প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। কিন্তু ইসলামকে জেনে বুঝে, আত্মস্থ করে ব্যক্তিজীবনে আমল করে, নিজের জ্ঞানবুদ্ধি বিবেক-বিবেচনা দিয়ে আত্মাকে প্রসারিত ও ব্যাপক এবং পবিত্র করতে পারলে তার দৃষ্টিভঙ্গির চিন্তা-ভাবনা এবং ল ও উদ্দেশ্য হবে সর্বজনীন, মানবীয় এবং সমগ্র মানবকল্যাণে সমৃদ্ধ। তখন তার আলো হবে সূর্যের আলোর মতো। শত্র“ মিত্র সবার জন্যে তার প্রেমময় দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটবে। তখন লেখকের কলম যা লিখবে তা ইসলামী হবে বলেই বিশ্বাস করি। কারণ ইসলামকে জেনে বুঝে আত্মস্থ করা ও ব্যক্তি জীবনে আমল করার অর্থই হলো কুরআন ও সুন্নাহর চিরন্তন আলোক রাজ্যে অবগাহন করা। তার থেকে আলোই ঠিকরে বেরুবে, তা অন্ধকার বিলোবে না। যেমন বরফের কাছে আমরা ঠাণ্ডারই আশা করি। বরফের কাছে কেউ তাপ আশা করে না।
একমাত্র ইসলামেই রয়েছে ব্যাপক বিস্তৃত চিন্তার রাজ্য, আর সেই চিন্তার আলোকে অজস্র কিসিমের রচনা লেখা সম্ভব। বর্তমানে একটা ইসলামী টিভি চ্যানেল চালাবার মতো কেনো অনুষ্ঠান তৈরি করা হয়তো আদৌ সম্ভব নয়। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে যে বিপুল প্রতিভাদীপ্ত তরুণদের উজ্জ্বল উপস্থিতি ল্য করা যায়, তারা যদি লেখালেখির জন্য প্রাথমিকভাবে নিজেদের প্রস্তুত করেন তবে তাদের দ্বারা বিপুল সংখ্যক চলচ্চিত্রই শুধু নয়, এমন সব বিভিন্নমুখী অনুষ্ঠান নির্মাণ সম্ভব যা দিয়ে একটা মাত্র ইসলামী টিভি চ্যানেল নয়, চার পাঁচটা টিভি চ্যানেল দিবারাত্র চালানো সম্ভব। ইসলামে এতো বিপুল, ব্যাপক ও বিশাল চিন্তার অবকাশ রয়েছে, আরো রয়েছে আগ্রহী প্রতিভাধর মেধাবী সব শিল্পী ও লেখক।
ইসলামী শিা আত্মস্থ করার পর, একজন লেখক যদি কোনো সাাৎকার অনুষ্ঠানের প্রশ্নমালা তৈরি করেন তবে প্রশ্নের স্টাইল এবং অর্থই হবে অন্য ধরনের। প্রশ্নগুলো জাহিলির পরিবর্তে হয়ে উঠবে মানবিক, সর্বজনীন এবং পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্যমাখা, যা সাধারণ দর্শকদের অন্তর্লোকে কারো প্রতি বিদ্বেষের বীজ বপন করবে না, বরং একটা পজেটিভ চিন্তাধারার চর্চা হবে। এমনিভাবে কোনো আলোচনা অনুষ্ঠান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন চিত্রের ভাষা এমনকি খবর পাঠের ভাষা, রঙ, রূপও বদলে যাবে।  জাহেলিয়াত ও ইসলামের পার্থক্য শুধু সামান্য কতোগুলো মোটা দাগের চিন্তা ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ পার্থক্য শোয়া, ঘুমানো, উঠাবসা, পানি খাওয়া থেকে শুরু করে আলাপচারিতা, সম্বোধন, ভাষা ও শব্দবিন্যাসে এবং শেষমেষ যুদ্ধ, সন্ধি সবকিছুতেই সেই পার্থক্যই ফুটে উঠবে একজন লেখকের কলমের ডগায়। কিন্তু ইসলামকে সঠিকভাবে না জেনে না বুঝে না গ্রহণ করে যদি কেউ কিছু লেখেন তবে তার লেখা দেখে মনে হবে তিনি মডেল হিসেবে জাহেলিয়াতকে সামনে রাখছেন, জাহেলিয়াতকে তিনি মানদণ্ড হিসেবে স্থির করেছেন। তাই তার লেখাগুলো জাহেলিয়তের ট্রাজেডি, কমেডি ও রোমান্টিকতায় পূর্ণ হতে পারে।
‘নাÑ ইসলাম তা নয়। আর তা যে নয় তা বুঝতে গেলে প্রথমে যা দরকার তা হলো মন-মস্তিষ্ক থেকে সমস্ত জাহেলি দৃশ্যপট ও চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে হবে। পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত পরিবেশের সমস্ত লোকজন ও বন্ধু-বান্ধব সম্পূর্ণ ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ ও ইসলামী চেতনায় উদ্দীপ্ত হতে হবে। তা না হলে তা সযতেœ বর্জন করতে হবে। চোখের মধ্যে গুঁজে কিছু দেখা যায় না। বস্তুকে একটু দূরে রাখলেই তা দেখা যায়। তদ্রুপ জাহেলিয়াতের বায়ুমণ্ডলে ডুবে থেকে জাহেলিয়াতকে চেনা সম্ভব নয়। ঈমানের সমুদ্রে ডুবে থেকে দূর থেকে জাহিলিয়াতকে দেখতে হবে। জাহিলি সংস্কৃতি যে কোনো মডেল বা মানদণ্ড নয়, ইসলাম যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির আধার এই সত্যটিকে স্পষ্ট দৃঢ়মূল ধারণা ও বিশ্বাসে যুক্তিসহ প্রথিত করতে হবে। যুক্তিসহ এই কারণে যে একজন লেখককে যুক্তি প্রদর্শন করতে হয়। একজন লেখককে যুক্তিবিষয়ক জ্ঞান লাভ করতে পারবেন যদি তিনি মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর রহ. এর রচনাগুলো গভীর
অন্তর্দৃষ্টিসহকারে পাঠ করেন। সঙ্গে সঙ্গে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী রহ. এর হুজাতুল্লাহিল বালিগাহ এবং অনুষঙ্গ হিসাবে মাওলানা আকরম খাঁ রচিত মোস্তফা চরিত, সাহাবা কেরাম (রা.)দের জীবনী ইত্যাদি।
পৃথিবীর সবকিছুই নির্দিষ্ট বন্ধনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় এবং কার্যকরী ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে। পূর্ণ স্বাধীনতা কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। মানুষের চিন্তাকেও নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থেকে ধাবিত করতে হয়। যতো বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাবিদ, অঙ্কবিধ, যতো শ্রদ্ধাভাজন নেতা, সমাজসেবক সবাই চিন্তা করেছেন নির্দিষ্ট গণ্ডিতে এবং সেই বন্ধনেই সফল হয়েছেন। যারা চিন্তার কোনো বন্ধন মানে না তারা নিজেরা যেমন বিভ্রান্ত, অন্যকেও ভ্রান্ত পথে তারা চালাবার চেষ্টা করে। আসলে তারা মানবতার জন্য অক্যাণকর। বিপ্তি মাটি তখনই কার্যকরী হয় যখন তা একটা নির্দিষ্ট বন্ধনের খাপে ভরে ইট তৈরি হয়। আমরা যা কিছু দেখি ব্যবহার করি তার সবই নির্দিষ্ট বন্ধনে আবৃত। চিন্তাকেও একটা সত্য ও সঠিক বন্ধনের আওতায় লালন করলেই তা কার্যকরী, কল্যাণকর ও সৃজনশীল হয়ে ওঠে। আর সেই সত্য ও সঠিক বন্ধনটি হলো ইসলাম। পবিত্র কুরআন ও রসুল (সা.)-এর হাদিস।
উপরোক্ত আলোচনার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে এটুকু নিশ্চিন্তে ও নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, চিন্তা-ভাবনা, অনুভব, উপলব্ধি, অনুধাবন মতা এবং মন-মস্তিষ্ক ও হৃদয়াবেগকে জাহেলিয়াতের বিপ্তিতা, বিশৃঙ্খলা ও সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত এবং পবিত্র করে ঈমানের চিরন্তন পবিত্র বন্ধনে বন্দি হতে হবে। ঈমানের ওপর ভিত্তি করেই পৃথিবীকে, মানুষকে, প্রাণী জগৎকে এবং বস্তুকে দেখতে হবে, ভাবতে হবে।
আপাতত দৃষ্টিতে জাহেলিয়াতে কোনো কর্মপদ্ধতিকে ভালো বা কল্যাণময় মনে হতে পারে, কিন্তু সেই ভালো ও কল্যাণের সঙ্গে ইসলামের ভালো ও কল্যাণময় পদ্ধতির আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
ছোট্ট একটা মাত্র উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টির সঠিকরূপ ধরা পড়েÑ যেমন নায়ক কোনো বস্তিতে গিয়ে খাদ্য বস্ত্র অর্থ বিলিয়ে দেয় গরিবদের মধ্যে (বাস্তবে রাজনীতিবিদরা যেমনটি করেন) এর পরিণামে দেখা যায় দর্শকরা নায়কটিকে ভালোবেসে ফেলে, তার কান্নায় কাঁদে, তার হাসিতে হাসে, তার কষ্টে কষ্ট অনুভব করে। এমন কি নায়কের এমনসব কর্মে নায়িকাও তাকে ভালোবেসে ফেলে।
জাহিলি দৃষ্টিতে নায়কের এই কাজটি ভালো কাজ নিঃসন্দেহে। কারণ জাহিলি বুদ্ধিজীবী ও নেতারা বলেন, মানুষ এতে গরিবদের সেবা করতে প্রেরণা পাবে। গরিবরাও উপকৃত হবে, এই ধরনের নানাবিধ যুক্তি দেখিয়ে জাহিলি দার্শনিক বুদ্ধিজীবী ও শাসক নেতাদের মতামত পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। জীবনের সকল দিক এমনকি শিশু থেকে তাবৎ মানুষের মন-মস্তিষ্ক, চিন্তাধারার রঙ, রূপ, রস, আর্বতন ইত্যাদি নিয়ে যে মনোবিজ্ঞান নামক পুস্তকাদি রচিত হয়েছে যা কলেজ ভার্সিটিতে পড়ানো হয় তার মধ্যে মানুষের আনন্দ, বেদনা, দুঃখ, বিরক্তি, রাগ, হিংসা-বিদ্বেষ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা বিস্তারিত মতামত পেশ করেছেন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। এমনিভাবে, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি বিষয়ক পুস্তকাদি এক কথায় মানুষের মানবিক নৈতিক ও আদর্শিক বিষয়ে যতো দিক আছেÑ যা ঐসব পুস্তকাদির মাধ্যমে ভালো, কল্যাণময় হিসেবে সর্বজনগ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে বিগত তিন শতাব্দি থেকে। আপাতত দৃষ্টিতে তার কল্যাণকারিতা বিশেষ কিছু শ্রেণীর মধ্যে বিচরণ করলেও পৃথিবীর কোনো অংশেই বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর মধ্যে তার কল্যাণকারিতা চোখে পড়েনি। মানুষ শুধু আশায় থাকে হয়তো তাদের ভাগ্যেও কল্যাণকারিতা জুটবে। কিন্তু গভীরভাবে ইসলামী মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক পুস্তকাদি অধ্যয়ন করলে বোঝা যাবে জাহিলি সমস্ত মতবাদ ও নিয়ম-প্রথা, রসম- রেওয়াজ ভুল এবং ব্যর্থ। আজও ইসলামী মতবাদ, সভ্যতা-সংস্কৃতি, আইন-কানুন সফল এবং কেয়ামত পর্যন্ত সর্বশ্রেণীর সমাজে তা সফলতাই বয়ে আনবে। (অহংকারী, লোভী, স্বার্থান্ধ, প্রভূত্বপ্রিয় এবং প্রতিহিংসা পরায়ণতার দোষে দুষ্ট ব্যক্তিদের সমাজ ব্যতিরেকে, ইসলাম এদের শত্র“, এরাও ইসলামের শত্র“।)
নায়কের উদাহরণটিতে আবার ফিরে আসা যাকÑনায়ক যে ভালো কাজ করলো তার ফলে কিছু দর্শক খুশি হলো, নায়িকা তাকে ভালোবাসলো। অর্থাৎ সবাই প্রত্য বা পরভাবে নায়কটির মতো হতে চাইলো। নায়কটি পার্থিব স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল অর্থাৎ নায়িকাকে পেতে চেয়েছিল তা সে পেলো।  এখন কেউ যদি বলে ‘কই নায়কতো কোথাও বলেনি যে সে এইকাজ করে নায়িকাকে পেতে চায়, কিন্তু সে রকম উদ্দেশ্য তার ছিল না।’ কিন্তু যদি প্রশ্নকর্তাকে উল্টো প্রশ্ন করা হয় তাহলে নায়ক এমন দান-খয়রাত করলো কেনো?  গরিবরা উপকৃত হবে বলে? সে নিজে তৃপ্তি পাবে বলে? লোকজন তাকে সম্মান দেবে বলে? প্রশ্নকর্তা হয়তো বলবেন হ্যাঁ। যদি হ্যাঁ অথবা না যাই ধরে নেয়া যায় তার শেষমেষ ফল হবে এই যে, এতে দর্শক ও নায়িকার মনে জন্মাবে শিরক। কোনো বিশেষ মানুষের নিজস্ব আদর্শের ওপর শর্তযুক্ত অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধা, যা পার্থিব স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করবে মানুষ এবং মাকড়সার জালের মতো ফিতনা জন্ম নেবে মানুষের অন্তরে। সমাজে তার প্রকাশ ঘটবেই। শিরকবাদী মানুষ শিরক উদ্ভুত ফ্যাসাদে লিপ্ত হবে। নেতাপূজা, ব্যক্তিপূজা, মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি, বিদ্বেষপরায়ণ জনগোষ্ঠী তৈরি, সঙ্কীর্ণ চিন্তার প্রসার, মানুষকে সফলতার মাপকাঠিতে শ্রদ্ধাভাজন করে তোলা, বিচার করা হয় না মানুষটি কোনো পথে কিভাবে সফল হলো … আদি রসাত্মক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরকে আদর্শ মনে করা তাদের মতো ইন্দ্রিয়পূজারী হতে চাওয়া, মানুষের অবাধ স্বাধীনতা স্বীকার করা, … এর ফলশ্র“তিতে সমাজে অস্থিরতা ও হিংস্রতার ব্যপ্তি ঘটানো এসবই জাহিলি ভালো ও কল্যাণময়তার প্রকাশ্য রূপ এবং ফসল।
(’শর্তযুক্ত’র অর্থ হলো, নায়ক পার্থিব স্বার্থ হাসিলের শর্তে ভালো কাজ করছে। দ্বিতীয়ত : সাধারণ মানুষের শর্ত হলো তুমি এই ধরণের কাজ করলে আমরা তোমাকে বরণ করবো। এর বিপরীতে ’শর্তহীন’ শব্দটি আমরা প্রয়োগ করতে পারি- ’তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমাকে অনুসরণ করো। এর জন্য আমি কোনো বিনিময় চাই না।’ প্রত্যেক নবী-রাসূলের  এই আহ্বান শর্তহীন ভালো কাজ করার শিা দেয়)।
আল্লাহর সন্তুষ্টির বাইরে হাজার রকমের লোক হাজার ধরনের ভালো ভালো কথা বললেও বা ভালো ভালো কাজ এবং পদপে গ্রহণ করলেও তার ফল দাঁড়ায় এমন যে, পাত্র একদিকে ভরলে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, সেদিকে চাপলে এদিক দিয়ে উপচে পড়ে যায়। কোনোদিকেই সামাল দেয়া যায় না। বহুজাতিক কোম্পানির ওষুধের মতো এক রোগ সারলেও অন্যরোগ ধরে।
জাহিলি মানুষের ভালোবাসার মধ্যেও কোনো কল্যাণকারিতা নেই। কারণ জাহেলিয়তের সব ভালো ও কল্যাণকারিতা ঈমানহীন। উল্লিখিত নায়ক যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান খয়রাত করতো তবে নায়িকা এবং দর্শকরাও আল্লাহ আকবর বলে ধ্বনি তুলতো। তারা আর শিরকে লিপ্ত হতো না এবং সবার মনে এই আগ্রহই জন্মাতো যে তারা আল্লাহর জন্যই দান-খয়রাত করবে। তখন ব্যক্তি নায়ক পূজনীয় হতো নাÑ আল্লাহই যে একমাত্র মালিক একথাই প্রতিষ্ঠিত হতো। আর এই কর্মের জন্য নায়ক নায়িকার রিপু তাড়িত ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতো। নায়িকা ভালোবাসতো ’আল্লাহকে ভালোবাসা এক ব্যক্তিকে’ পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য দান খয়রাত করা কোনো ব্যক্তিকে নয়। এমনিভাবে সমস্ত দুনিয়ায় ঈমানের সঙ্গে সৎকাজ শুধু কল্যাণই ছড়ায়। ফিতনা ফ্যাসাদ দূরীভূত হয়। তখন হাজার কোটি লোকের হাজার কোটি ভালো কথা ও ভালো পদপে নেবার দরকার হয় নাÑ তখন একজন আবু বকর (রা.) অথবা একজন হযরত ওমর (রা.) এর একটি কথাই ডালপালা বিস্তার করে সমস্ত পৃথিবীতে কল্যাণের শীতল বৃষ্টিপাত ঘটাতো। এবং আজও ঘটাবে ইনশাআল্লাহ। জাহেলিয়াতের প্রতিটি ভালোকে গভীরভাবে চিন্তা করলে তার ভিতরের সমস্ত অকল্যাণকারিতা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়বে।
আমাদের বুদ্ধি বিবেচনা আর জ্ঞানের বাইরেও বহুবিদ মন্দ এবং অকল্যাণ রয়েছে যার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও আমাদের জ্ঞানের বাইরে, এখনো উদঘাটিত হয়নি এমন বহু ভালোর মধ্যে খারাপ রয়েছে। তাই এমন সব বিষয় নিয়ে লিখতে হলে সেখানে ঈমান সহযোগে তা লিখতে হবে, যা আল্লাহপাক হুকুম করেছেন। তাহলে অবশ্যই সেইসব রচনার কল্যাণকারিতা প্রতিটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ  ও রাষ্ট্রে চিরন্তন স্পর্শ ফেলবে। শুধুমাত্র লেখককে চারটি বিষয় আস্থা রাখতে হবে।
১. আল্লাহ আখেরাত ও রিসালাতের প্রতি পূর্ণ ঈমান
২. আল্লাহর সঙ্গে লেখকের নিজস্ব সম্পর্ক দৃঢ়তর করা
৩. রচনায় বা গল্পে, পরিবেশ, চরিত্র, ঘটনা ও সংলাপ রচনায় নীতিগত বৈশিষ্ট্য রায় আল্লাহর প্রতি ভয় পোষণ। যেমন : পুত্র কখনো পিতার কাঁধে হাত রেখে বলবে নাÑ হ্যালো ড্যাড, আমি ঐ মেয়েকে ভালোবাসি। ইসলাম পিতাপুত্রের বন্ধুত্ব সম্পর্ক রার কথা বললেও সেখানে নৈতিকতার বন্ধন আছে। পুত্র পিতাকে সম্মান করবে, ভয় করবে, মান্য করবে এবং লজ্জা করবেÑ এটাই ইসলামী নৈতিকতা। জাহেলিয়াত এই নৈতিকতাকে অনুসরণ করে এসেছে দীর্ঘকাল। এখন জাহেলিয়াতের চাকচিক্যে সবকিছু ভুলে গিয়ে এই অনৈতিকতাকে ইসলাম অনুসরণ করতে পারে না। এ ধরনের অনৈতিকতায় পরিবার ও সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
৪. চরিত্রগুলির আচার-আচরণ, লেন- দেন, কথা-বার্তা সংযোজনে পরকালকে সামনে রাখতে হবে। মোটকথা আল্লাহর আইনকে মান্য করা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা, তাকে সমর্থন করা অনুসরণ করা একজন লেখকের অবশ্যই ফরজ। (রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর প্রতিটি আইনের সামনে মাথা নত করে দিয়েছেন এবং মান্য করেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন।)
উক্ত বিষয়গুলি অধ্যবসায়, অনুশীলন ও সাধনার মাধ্যমে নিজের জীবনে প্রতিফলিত করতে পারলেই তার রচনার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকে তা ল্য করা যাবে বা ফুটে উঠবে। লেখক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য উপরোক্ত বিষয়গুলি একান্ত প্রয়োজন। এতোণ যে যে বিষয়ের ওপর আলোচনা হলোÑ যেমন সংস্কৃতি সংক্রান্ত গণমাধ্যমের জন্য চারটি মৌলিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য, চারটি প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও চারটি বিষয় ভালো করে রপ্ত করা বুঝা, অনুধাবন ও আত্মস্থ করার পর লেখককে ভাবতে হবে এই আদর্শকে তিনি প্রতিটি ব্যক্তিজীবনে, পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কারণ আল্লাহপাকের ঘোষণা অনুযায়ী   মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার মূলমন্ত্র অর্থাৎ আল্লাহর দীন পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের পথে ডাক দেবার দায়িত্বে তিনি নিয়োজিত।
মনে মস্তিস্কে এই বিশ্বাস গেঁথে নেবার পর লেখার জন্য পাঁচটি মৌলিক উপাদান তাকে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে বুঝে নিতে হবে।
১. পার্থিব জীবন সম্পর্কে লেখকের ধারণা। ২. লেখকের জীবনের চরম ল্য। ৩. লেখকের বুনিয়াদী আকীদা ও চিন্তাধারা। ৪. সংগঠনিকভাবে লেখক প্রশিতি কি না। ৫. সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে লেখকের সম্যক ধারণা।
দুনিয়ার প্রত্যেক সংস্কৃতি এই পাঁচটি মৌলিক উপাদান দিয়েই গঠিত হয়েছে। বলা বাহুল্য ইসলামী সংস্কৃতিরও সৃষ্টি হয়েছে এই উপাদানগুলোর সাহায্যই। (মাওলানা মওদূদী রহ. ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা।)
প্রবন্ধের প্রথম থেকে আলোচিত গুণ বৈশিষ্ট্যগুলো এবং উপরোক্ত পাঁচটি উপাদানকে সমন্বয় ঘটিয়ে এক একজন লেখক যদি নিজেকে প্রস্তুত করেন তবে চলচ্চিত্র ও মিডিয়া ইসলামী সংস্কৃতির জোয়ার আনতে পারবে, যে জোয়ারে ভেসে যাবে জাহেলিয়াতের সমস্ত সংস্কৃতির শয়তানি খেলা।
আগ্রহী পাঠকদের সুবিধার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উপরোক্ত পাঁচটি মৌলিক উপাদানের তিনটি উপাদানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ জানার জন্য তারা মাওলানা মওদূদী রচিত ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা’ বইটি পড়তে পারেন। বাকি দুইটি উপাদান যথা ‘ব্যক্তি সংগঠন’ যা আমি ‘সাংগঠনিকভাবে লেখক প্রশিতি কিনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছি এবং সমাজব্যবস্থা’ সম্পর্কে জনার জন্য মাওলানা তার রচিত ‘হাকীকত সিরিজ’ এবং ‘ইসলামের জীবন পদ্ধতি’ পুস্তকের নাম উল্লেখ করেছেন।
যারা চলচ্চিত্র বা মিডিয়ার জন্য লিখতে আগ্রহী তারা এই প্রবন্ধের অন্যান্য গুণ ও বৈশিষ্ট্য অর্জনের পাশাপাশি অবশ্যই ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা, হাকীকত সিরিজ এবং ইসলামী জীবন পদ্ধতি পড়বেন, বারবার পড়বেন।
একজন লেখক যদি যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারে তবে মিডিয়ার জন্য তার লেখার মধ্যে কোনো বিকৃতি থাকবে না। আর  যথার্থ জ্ঞান বলতে একমাত্র আল্লাহপাকের কুরআনের জ্ঞান। কুরআনের জ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো উৎসের জ্ঞান ত্র“টিযুক্ত। ত্র“টিযুক্ত শিা ও সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বলেই তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। কল্যাণ থাকলে ইসলামী জ্ঞানের প্রয়োজন হতো না। অতএব লেখককে কুরআন ও হাদিস বারবার অর্থসহ বুঝে পড়তে হবে।
আগেই বলেছি জাহিলি চলচ্চিত্র বা মিডিয়ার প্রদর্শন ইসলামী মিডিয়ার মডেল বা মানদণ্ড হতে পারে না। ইসলাম একটি আদর্শ একটি চিরন্তন জীবনব্যবস্থা। অন্ধকার নেমে এলে যেমন আলো জ্বালাতে হয়, জাহিলি সমাজে তেমনি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আর ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা লিপ্ত তারা যা কিছু প্রচেষ্টা চালাবে তা ঐ ইসলামী আদর্শ মোতাবেক। ভিন্ন আদর্শে ইসলাম প্রতিষ্ঠা চলে না। অতএব আদর্শটিকে আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে। আর শুধু বুঝলে হবে নাÑ পূর্ণাঙ্গ ঈমানের সাথে বুঝতে হবে। মেনে নিতে হবে। পালন করতে হবে।
আন্দোলনে শরিকদের শুধু প্রতিভা থাকাটাই যথেষ্ট নয় বরং ঈমানের সঙ্গে জেনে বুঝে প্রতিভার বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। এজন্য তাফহীমুল কুরআন, ইসলামী সাহিত্য, রাসূল (সা.)-এর জীবন ও সংগ্রাম, সাহাবা (রা.)দের জীবন ও কর্ম গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। এছাড়াও নিম্নের বইগুলো পড়া যেতে পারে।
১. আল জিহাদ। ২. উপমহাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ও মুসলমান। ৩. ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন। ৪. ইসলমের রাজনৈতিক মতবাদ। ৫. শান্তিপথ। ৬. ইসলামের শক্তির উৎস। ৭. ইসলাম ও জাহেলিয়াত। ৮. মুসলমানদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি। ৯. ইসলামে নৈতিক দৃষ্টিকোণ। ১০. পলাশী থেকে বাংলাদেশ। ১১. পর্দা একটি বাস্তব প্রয়োজন। ১২. ইসলামী বিপ্লবের পথ। ১৩. সত্যের স্যা। ১৪. নির্বাচিত রচনাবলী। ১৫. রাসায়েল মাসায়েল।
অন্যান্য রচনাবলীর মধ্যে শেখ সাদী রাহ.-এর গুলিস্তা, বোস্তা এবং ইমাম গাজ্জালী (রা.) রচিত পুস্তকাদি লেখকের জন্য উপকারী গ্রন্থ। (যদিও ইমাম গাজ্জালী রা. রচিত পুস্তকাদিতে বর্ণিত কিছু হাদিস বিতর্কিত, তাই সুবিধার্থে সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করতে হবে।)
মহান আল্লাহ পাকের কাছে সাহায্য চেয়ে উক্ত বিষয় এবং পুস্তকগুলো পড়ে যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হবেÑ সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে চলচ্চিত্র ও মিডিয়ার জন্য লেখালেখি করলে সেই লেখাগুলো ইসলাম সমর্থিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী ও জ্ঞানদাতা এবং আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
https://www.youtube.com/watch?v=prCNS-x-rZA&list=PLUYnAqYejfO2U_z94AMbUnJVP3dRdzOtL&index=3
শেখ আবুল কাসেম মিঠুন

সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের জন্যই ওবায়দুল হক সরকারকে প্রয়োজন


কোন মুমিন ব্যক্তি জাহেলী আইনের অধীনে কখনো সুখে ও নিশ্চিন্তে দিন যাপন করতে পারেন না। জাহেলী আইন ব্যবস্থায় মদ সিদ্ধ, কিন্তু ইসলামী আইন ব্যবস্থায় তা নিষিদ্ধ। বিজ্ঞানও স্বত:স্ফুর্তভাবে স্বীকার করে যে, মদ শুধু বুদ্ধিভ্রম ঘটায় না, মদ শরীরের অভ্যন্তরে কিডনী, লিভার পাকস্থলী ও হার্টের উপরও অত্যন্ত ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। মহা বিজ্ঞানময় আল্লাহতাআলা মদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। এমনিভাবে মানবতার কল্যাণের জন্যই সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহরব্বুল আলামীন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেসব নিয়ম কানুন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন এবং তা যখন কোন মানব সমাজ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিধিবদ্ধ করে নেয়, কেবল তাঁর অধিনেই একজন মুমিন জীবন যাপন করে স্বস্তি পাবে। আর যখন বিপরীত আইন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায় তখন মুমিনের অন্তর্জালার সীমা থাকে না।
মুমিন প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেন আল্লাহর দুনিয়াতে আল্লাহর দেয়া নীতি নিয়ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কিভাবে কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। কিন্তু সবার পক্ষে একইভাবে সেই চেষ্টা করা সম্ভব হয় না।
আল্লাহতালা বলেছেন, ‘তোমরাই সর্বোত্তম দল, তোমাদেরকে মানুষের হেদায়াত ও সংস্কারের জন্য কর্ম ক্ষেত্রে উপস্থিত করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে।’ আল ইমরান:১১০।
আবু সাঈদ আল খুদরী রা. বলেন, ‘আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের কেউ যখন কোন খারাপ কাজ হতে দেখে সে যেনো তা হাত দিয়ে [শক্তি প্রয়োগে] বন্ধ করে দেয়। যদি সে এ ক্ষমতা না রাখে তবে যেনো মুখের কথার দ্বারা [জনমত গঠন করে] তা বন্ধ করে দেয়। যদি সে এ ক্ষমতাটুকু না রাখে তবে যেনো অন্তরের দ্বারা [পরিকল্পিত উপায়ে] এটা বন্ধ করার চেষ্টা করে বা এর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। আর এটা হলো ঈমানের দুর্বলতম এবং নিম্নতম স্তর।’
অতএব দেখা যাচ্ছে জাহেলী কর্মকান্ডের মধ্যে মুমিনদের চুপচাপ বসে থাকার কোন সুযোগ নেই।
চলচ্চিত্র, মঞ্চ, রেডিও এবং টেলিভিষণ ব্যক্তিত্ব ওবায়দুল হক সরকারও চুপচাপ ছিলেন না। তিনি তাঁর নাট্য সংগঠন ও লেখনীর মাধ্যমে অকল্যাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। আমরা যদি তাঁকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমন কি চলমান রাষ্ট্রিয় সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি তবে তাঁকে সঠিকভাবে বুঝা সম্ভব হবে না।
ওবায়দুল হক সরকারের শিল্পী জীবনের কর্মকাণ্ড ও তাঁর রচনা পাঠ করলে আদর্শের পথে তাঁর চেষ্টা এবং জাহিলীয়াতের আঘাতে তাঁর রক্তাক্ত অন্তর্লোকের যন্ত্রণা উপলব্ধি করা সম্ভব আর সে যন্ত্রণার স্পষ্ট স্বরূপ ছায়াছবির মতো আমাদের সামনে ভেসে উঠবে যদি আমরা তাঁকে আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝবার চেষ্টা করি। আমরা জানি একটা রুট ‘আইডিয়া’কে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র ও নাটকের শারীরিক কাঠামো বিন্যস্ত হয়। চরিত্রগুলোর আবেগ, তাদের চিন্তা, কাজ ও ঘটনা বিন্যাস হয় সবই ঐ রুট আইডিয়াকে ঘিরে। তেমনি একজন মানুষের সমস্ত চিন্তা, কর্ম এবং তার আবেগ তাড়িত হয় তার নিজস্ব একটা রুট আইডিয়াকে ঘিরে। ওবায়দুল হক সরকারের রুট আইডিয়াটি ছিলো- ‘মুসলমানদের চিন্তাগত ও বৈষয়িক উন্নতি সাধন।’ আর সে উন্নতি সাধনের পথে বিরোধীদের যে বাঁধা, শত্রুতা, প্রতিরোধ বা আঘাত- তিনি তাকেই প্রতিরোধ করেছেন। পাশাপাশি এগিয়ে যাবার এবং এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন।
১৯৫১ সালে তিনি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন এনায়েত উল্লাহ খান, আনোয়ারুল আজিমসহ কিছু তরুণ প্রতিভা। এক এক করে নাটক মঞ্চস্থ করেন ‘জবানবন্দী, নার্সিংহোম, নবান্ন, পথিক, রক্তের ডাক ইত্যাদি।’ সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের নিয়ে প্রথম মঞ্চস্থ নাটকেও তাঁর ছিলো বিশেষ অবদান। বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীকে ঘষা-মাজা করে হীরক খন্ডের মতো উজ্জ্বল করে তুলতে সাহায্য করেছেন। তার নিদর্শন চিত্রনায়িকা কবরী, চলচ্চিত্রও নাট্যাভিনেতা আবুল হায়াত, জামাল উদ্দিন, আবুল কাশেম, গোলাম রব্বানী এবং নাটক ও অনুষ্ঠান নির্মাতা শাহ আলম নূর প্রমুখ। যারা তাঁকে ‘ওস্তাদ’ বলে সম্বোধন করতেন।
চলচ্চিত্রের গুণি পরিচালকরা জনাব ওবায়দুল হক সরকারকে মূল্যায়ন করতেন। তাইতো আমরা দেখি, পরিচালক মিতার ‘লাঠিয়াল’ সুভাস দত্তের ‘বসুন্ধরা’ ও ‘আকাংখা’ খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ শহীদুল হক খানের ‘ছুটির ফাঁদে’ এহতেশামের ‘বন্দিনী’ আমজাদ হোসেনের ‘দুই পয়সার আলতা’ ছবিতে- তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। প্রায় পঞ্চাশটির মতো চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। প্রতিটি চলচ্চিত্রই সেই সময় সুধি দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। এবং ওবায়দুল হক সরকার দর্শকদের হৃদয় জয় করেছিলেন।
মঞ্চ, রেডিও, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র- এই চারটি মাধ্যমে তিনি তাঁর জীবনের ষাটটি বছর কাজ করে গেছেন। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন মঞ্চে কয়েক হাজার নাটক তিনি পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের বিচারক ছিলেন বেশ কয়েক বছর। পাশাপাশি সরকারী চাকরিও করে গেছেন। ওবায়দুল হক সরকারের এতসব কর্মকান্ডের প্রতি পরতে পরতে জড়িয়ে ছিলো তাঁর অতিতের তিক্ত অভিজ্ঞতা। ইংরেজ আমলের পুলিশ অফিসার পিতা জনাব আলী হুসেন সরকারের ছিলো বদলীর চাকরি। সেই সুবাদে পশ্চিম বঙ্গের হাওড়া, হুগলী, বাঁকুড়া, বীরভূম- নদীয়াতে কাটিয়েছেন এমন এক বয়সে- যে বয়সে একজন মানুষের মন-মস্তিস্কের ভিত তৈরি হয়। তিনি দেখেছেন মুসলমানদের ওপর হিন্দুদের বৈষয়িক ও মানষিক নির্যাতন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে পশ্চিম বঙ্গের বাঁকুড়াতেই তিনি প্রথম নাট্য মঞ্চে অভিনয় করেন। তাঁর শিল্পী মন ছিলো নরম সংবেদনশীল। তখনি পরিবার থেকে, স্বজন থেকে প্রবল বাধা তাঁকে চিন্তা করতে শিখায় মুসলমানদের সংস্কৃতি সম্পর্কে। তিনি তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘কুরআনপাকে নাটক নিষিদ্ধ কিনা সে সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলেও আমাদের ধর্মীয় নেতারা নাচ, গান, নাটক-থিয়েটারকে হারাম বলে ফতোয়া দিলেন।’
ওবায়দুল হক সরকার তাঁর একটি রচনায় অভিনয় সম্পর্কে একটি ঘটনা ব্যক্ত করেছেন- এখানে সে বিষয়ে উল্লেখ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না- ঘটনাটা তাঁরই জবানীতে উল্লেখ করছি, ‘… আমাদের বাসায় এক আলেম এলেন, আমাকে আদর করলেন। যেই জানলেন আমি নাটক করি অমনি বলে উঠলেন, ‘অস্তাগ ফিরুল্লাহ, অস্তাগ ফিরুল্লাহ- না না ঐ শয়তানের ফেরে পড়লে সব যাবে। না না অভিনয়ের ধারে কাছে যাবে না, তা হলে একেবারে ‘হাবিয়া দোযখ’। আমি বললাম, ‘হজুর আপনিইতো ওয়াজে বললেন অভিনয় করতে। তিনিতো আসমান থেকে পড়লেন। আমি বললাম, ‘বললেন না, আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে মুনাজাত করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। চোখে পানি না এলেও চোখ মুখে কান্নার মতো ভঙ্গি করবে।’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ বলেছি, তা এর সাথে অভিনয়ের সম্পর্ক কী?’ আমি বললাম, ‘ঐ ভং ধরাইতো অভিনয়। কান্না না এলেও কান্নার মতো ভঙ্গি করা- আল্লাহই তো অভিনয় করার কথা বলেছেন।’ শুনে হুজুরের মুখে আর কথা নেই। এতো গেলো স্বজাতির বাঁধা। তৎকালীন সময় মুসলমানরা ছিলো বর্ণহিন্দুদের কাছে ঘৃণার বস্তু। ঐ সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুসলিম বিরোধী কবিতা হিন্দুদেরকে মুসলমানদের ঘৃণা করতে উৎসাহ যোগাতো, যেমন- ওবায়দুল হক সরকার উল্লেখ করেছেন- রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
শোনরে যবন শোনরে তোরা
যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি যবে
সাক্ষী রলেন দেবতা তার
এর প্রতিফল ভুগিতে হবে।
দ্যাখরে যবন, দ্যাখরে তোরা
কেমনে এড়াই কলঙ্ক-ফাঁসী
জ্বলন্ত অনলে হইবো ছাই
তবু না হইব তোদের দাসী।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুসলমানদেরকে যবন বলতেন। [যবন অর্থ: বনিষ্ঠির আশ্রমদ্রোহী বিশ্বমিত্রের কামধেনু, একটি গাভী। যার যোনিদ্বার হতে মুসলমান জাতি উৎপন্ন হয়েছে। ‘নাউজুবিল্লাহ’- আশুতোষ দেব, নতুন বাঙলা অভিধান]
মুসলমানদের উপর চরম ঘৃণা এবং লাঞ্ছনার শেষ সময়ে ওবায়দুল হক সরকারের নাট্যমঞ্চে উত্থান। তিনি দেখেছেন কিভাবে প্রখ্যাত অভিনেতা কাজী খালেক ‘স্বপন কুমার’ নাম নিয়ে ‘মানুষের ভগবান’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। কারণ কোনভাবেই মুসলমানদেরকে হিন্দুরা সহ্য করতো না। অথচ তাদের সর্বভারতীয় সংগঠন কংগ্রেস উল্টো মুসলমানদেরকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে প্রচার চালাতো। এই কারণেরই মওলানা আকরম খাঁ কংগ্রেস ত্যাগ করেন এই বলে যে, ‘তারাই সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক। অথচ অসাম্প্রদায়িক মুসলামনদের উপরই তারা এই দোষটা জোর করে, ছলচাতুরি করে চাপিয়ে দিচ্ছে।’
ওবায়দুল হক সরকার তখন ষোল বছরে পা দিয়েছেন- এই সময় চলচ্চিত্র পরিচালক ঈসমাইল মুহাম্মদকেও নাম বদল করে উদয়ন চৌধুরী নাম নিয়ে তার চলচ্চিত্র মুক্তি দিতে হয়েছিলো। তাতেও পরিচালক রেহাই পাননি- রাজনৈতিক মতবাদের ভিন্নতার কারণে উদয়ন চৌধুরী ও তার কয়েকজন সহকারীকে কারাবরণ করতে হয়।
অবজারভার পত্রিকার সদ্য প্রয়াত সম্পাদক ওবায়দুল হক ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি ‘দু:খে যাদের জীবন গড়া’- নামে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেবার সময়ও বাধ্য হয়ে নাম পরিবর্তন করেছিলেন- ‘হিমাদ্রী চৌধুরী’। তবুও তিনি মুক্তি পাননি- তার ছবিতে হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গার যে দৃশ্য ছিলো তা কেটে ফেলতে হয়েছিলো।
বিখ্যাত অভিনেতা ফতেহ লোহানীর নাম বদলে ফেলে ‘কিরণ কুমার’ নাম রাখা হয়।
যখন পাকিস্তান স্বাধীন হলো- ওবায়দুল হক সরকার লিখেছেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর মুসলমানদের দেশ পাকিস্তানে জনাব ওবায়দুল হক আরো কয়েকটি ছবি করেছিলেন- তখন আর হিন্দু নাম নিতে হয়নি, স্বনামেই ছবি রিলিজ দিয়েছিলো।’
আমরা জানি কাজী খালেক, ফতেহ লোহানী, ঈসমাঈল মুহাম্মদ এরাও মুসলমান নাম নিয়ে মুসলমানদের দেশে কাজ করে গেছেন।
স্বচক্ষে দেখা, স্বহৃদয়ে অনুভব করা কর্মকান্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ এবং নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার যে অভিজ্ঞতা আর সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আত্মসমালোচনা করে নিজেকে, দেশকে ও জাতিকে বিশ্লেষণ করার যে দৃষ্টিভঙ্গি তা ওবায়দুল হক সরকারের ছিলো। ছিলো বলেই তিনি কলম হাতে তুলে লিখেছিলেন, প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলেন। যেমনটি হয়েছিল ১৮৭০ সালের পরবর্তী বছরগুলিতে।
১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজদৌলার পতনের সঙ্গে সঙ্গে যখন মুসলমানদের পতন হলো- তারপর থেকে মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে রাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্র থেকে ইসলামের সমস্ত আইন কানুনকে বিদায় করে জাহেলী আইন কানুন জারী করা হলো- এ উপমহাদেশে মুসলমানরা হয়ে পড়লো বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত এক জাতি। তাদের বেঁচে থাকার সমস্ত উপায় উপাদান কেড়ে নেয়া হলো। অস্তিত্ব তখন বিলুপ্তির পথে, ১৮৫৭ তে একবার স্বাধীন হয়ে বেঁচে থাকার জন্য মাথা তুলতেই অত্যন্ত নিষ্ঠুর নির্দয়ভাবে সে মাথা গুড়িয়ে দেয়া হলো। কিন্তু আর কতো! ১৮৭০ সালের পর কতিপয় লেখক-সাহিত্যিক হাতে কলম তুলে নিলেন- কতিপয় রাজনীতিবিদ কৃতদাসের জীবন থেকে মুসলমানদের উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে এলেন। শুরু হলো সমিতি, সংগঠনের ভিত্তি স্থাপন, শুরু হলো লেখালেখি। যদিও মুসলমানদের সমিতি সংগঠন তৈরি করতে দেখে হিন্দুরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিলো। ‘সোম প্রকাশ’ নামের একটি পত্রিকায় লেখা হলো- ‘নগরবাসী সদ্বিদ্বান ও সম্ভ্রান্ত যবনেরা স্বজাতির হিত বন্ধনার্থে এক সভা স্থাপন করিয়াছেন।’ এই সব ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকে- বিদ্রুপ করে এগিয়ে গিয়েছিলেন মুসলমান লেখকরা। বলা হয়ে থাকে কবি সাহিত্যিকরা আজ যা ভাবে আগামীতে রাজনীতিবিদরা সফল সংগ্রামের মাধ্যমে সেই ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করে রাষ্ট্রীয় নীতিতে। যেমনটি ইউরোপে হয়েছে। মৌলবাদী খ্রীষ্টানদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে সে সময়ের কবি সাহিত্যিকরা যা ভেবেছিলো পরবির্ততে রাজনীতিবিদরা তাদের ভাবনাকেই রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করেছে।
উপরোক্ত আলোচনা প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে যায় যখন আমরা ওবায়দুল হক সরকার সম্পর্কে আলোচনা করি। তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে মুসলমানদের শত্রুদেরকে চিনিয়ে দিয়েছেন- তাঁর সাহসী কলম কাউকে পরোয়া করেনি। কারণ তাঁর রুট আইডিয়া ‘মুসলমানদের চিন্তাগত ও বৈষয়িক উন্নতি সাধন’- তাঁর সুদীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতায় আরো পুষ্ট হয়েছে।
তিনি লিখেছেন, ‘এক হাজার মসজিদের শহর ঢাকা এখন পরিণত হয়েছে একহাজার মুর্তির শহরে।’ তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম এবং ইসলামের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর বাংলাদেশের বৃহত্তম জাতীয় উৎসব। অথচ ২১ অক্টোবর ২০০৪, দৈনিক ইনকিলাবে মান্নান ভূঁইয়া বলেছেন, ‘দূর্গা পূজা এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।’ তিনি লিখেছেন, ‘মুসলমানদের অনুষ্ঠান কুরআন পাকের তেলওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়- অথচ মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে ‘উৎসের সন্ধানে’ শীর্ষক থিয়েটার উৎসবের উদ্বোধন করেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল।’ তিনি এমনিভাবে তৎকালীন বাংলাদেশের [২০০১] প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং [১৯৯৬] তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধনের বিরুদ্ধে লিখেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘হিন্দু গৃহস্থ বাড়িতে প্রতি সন্ধ্যায় তুলসী তলায় মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়, দূর্গা পূজা ও অন্যান্য পূজা-পার্বনে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো হয়। তা হলে মুসলমানরা কেনো পবিত্র কুরআন তেলওয়াত বর্জন করে হিন্দু সংস্কৃতি গ্রহণ করবে!’ এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন- ‘নীরদ চৌধুরীর দি অটোবায়োগ্রাফি অব এ্যান আননোন ইনডিয়ান’ গ্রন্থের কথা, যেখানে লেখক মুসলমানদেরকে ‘হিন্দুর সেবাদাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ওবায়দুল হক সরকার তাঁর চলচ্চিত্রিক মনের পর্দায় মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো দৃশ্যকে সেই সেবাদাসেরই ছায়া দেখেছেন। ‘হিন্দুর সেবাদাস মুসলমান’- নীরদ চৌধুরীর এই কথাটা যেনো সত্য হয়ে না যায় এই চিন্তায় তিনি শঙ্কিত হয়েছেন আতংকিত হয়েছেন।
ওবায়দুল হক সরকারের মুসলিম হৃদয়ের পাত্র ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে যখন তিনি স্মরণ করেছেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার রচিত ‘সরোজীনি’ নাটক যা মুসলিম বিদ্বেষে ঠাসা, তা মঞ্চস্থ হওয়ার সময়ে যখন হিন্দু দশর্করা ‘মারমার কাটকাট’ বলে আসন ছেড়ে ওঠে। ঐ নাটকের গানগুলো রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এমনিভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এবং মুসলমানদের চিন্তাগত ও বৈষয়িক উন্নতিতে যখনি কেউ আঘাত করেছে তা ওবায়দুল হক সরকারের দৃষ্টিতে পতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন তাঁর লেখনির মাধ্যমে।
কারণ কি! কারণ এই হাদীসটির মধ্যেই নিহিত- ‘সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একটি শরীরের ন্যায়, শরীরের এক স্থানে একটি ফোঁড়া হলে যেমন সমস্ত শরীরটি যন্ত্রণা দগ্ধ হয় তেমনি উম্মাহর কোন একজন বিপদগ্রস্থ হলে সমস্ত মুসলিম সমাজের দেহটি যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকবে।’
ওবায়দুল হক সরকার একজন মুসলিম ছিলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর একজন উম্মত ছিলেন। মুসলমানদের বৈষয়িক এবং মানসিক সংস্কৃতির উন্নয়ন চেয়েছিলেন। এতো গভীরভাবে চেয়েছিলেন যে তাঁর অন্তর্লোকের দরজা খুলে তাঁর চিন্তার নির্যাস বের হয়ে এসেছে। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করা উদ্দেশ্য নয়- ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করাই ছিলো উদ্দেশ্য’।
আজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং বাংলাদেশকে নিয়ে বহির্বিশ্বে যা ঘটছে- যদি আমরা ওবায়দুল হক সরকারের উক্ত মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করি তবে বিরোধী শক্তির সমস্ত তৎপরতার আসল উদ্দেশ্য আমাদের সামনে উদঘাটিত হবে।
একজন ওবায়দুল হক সরকার- যিনি একাধারে চলচ্চিত্র, নাটক, রেডিও এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব- তাঁকে চর্চা করার উদ্দেশ্য এটাই যে, তাঁর মতো সাহসী পদক্ষেপে প্রজন্মকে এগিয়ে যেতে হবে।
শ্রদ্ধেয় মাহবুবুল হক ভাইয়ের একটা লেখায় পড়েছি- তাঁর কাছে ওবায়দুল হক সরকারের অর্থনীতির অধ্যাপিকা কন্যা ফ্লোরা সরকার বলেছেন, ‘আব্বার লেখাগুলো মাঝে মাঝে আমার কাছে সাম্প্রদায়িক দোষে দুষ্ট বলে মনে হতো। কোন কোন লেখা সৌজন্যের সীমানা অতিক্রম করেছে বলে মনে হতো, অনেকে আমাদের কাছে এসব নিয়ে অনুযোগও করতো।’ আব্বাকে বললে তিনি জবাব দিতেন, ‘আমি তো রেফারেন্স ছাড়া কোন কিছু লিখিনি, আড়াল করা সত্যকে আমি প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছি মাত্র।’
‘চিলে কান নিয়ে গেছের মতো অবস্থা।’ চিলের পিছনে দৌড়ানো। অর্থাৎ ‘সাম্প্রদায়িকতা’- বলে বলে তা নিয়েই নিজেকে অপরাধী ভাবা, কিন্তু আসল সত্যকে আমরা চিনতে চেষ্টা করি না। ওবায়দুল হক সরকার সেই সত্য চিনতে সাহায্য করেছেন।
তাঁকে চর্চা করার এই মুহূর্তে আমরা তাঁর কর্মকান্ডের দলিল সংরক্ষণ, তাঁর রচিত পুস্তক সংরক্ষণ ও প্রচার এবং অপ্রকাশিত পাণ্ডলিপিগুলোকে প্রকাশ করার আশা ব্যক্ত করতে পারি। তাঁর বাড়ির পাশের রাস্তাটিকে তাঁর নামে নামকরণসহ নাটকের ক্ষেত্রে তার নামে কোন সংগঠন যদি পুরস্কার প্রবর্তিত করে তবে তা হবে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত- যা নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে, প্রেরণা ও শক্তি যোগাবে। এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আমরা মহান আল্লাহর দরবারে ওবায়দুল হক সরকারের রূহের মাহফেরাত কামনা করি।
 আমিন।
-- শেখ আবুল কাসেম মিঠুন ।

সুস্থ সংস্কৃতির ভিত্তি

সুস্থ সংস্কৃতির ভিত্তি



আমি সংস্কৃতিবান লোকদেরকে ‘সত্যকে’ এইভাবে দেখতে বলি যে, আগুন তাপ দেয়, কখনো ঠান্ডা দেয় না। আগুন কারো জন্য উষ্ণ কারো জন্য ঠান্ডা এমন নয়। আবার ঝড়ের কথা আমরা বলতে পারি, ঝড় গাছ-পালা ভাঙ্গে, ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে-চুরে ফেলে, জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে এবং জান-মালের প্রচুর ক্ষতি করে। ঝড় কালো ফর্সা দেখে না, ধনী-গরিব দেখে না, শিক্ষিত- অশিক্ষিত দেখে না। আগুন বা ঝড় দৃশ্যমান বস্তু। কিন্তু যা অদৃশ্য যেমন ক্রোধ, প্রতিহিংসা বা লালসা এসব বিষয়গুলো নিজের এবং অপরের চরম ক্ষতি করে। লোভ-ক্রোধের কাছেও কোন বাছ-বিচার নেই। সবল-দুর্বল, ক্ষমতাবান বা অসহায় সবার সমান ক্ষতি করে। অর্থাৎ যা কিছু মন্দ এবং ক্ষতিকারক তা সবার জন্য মন্দ এবং ক্ষতিকারক। বিপরীতদিকে- যা কিছু ভালো ও সুন্দর তা সবার জন্য ভালো ও সুন্দর।
আজ তুমি ক্ষমতাবান বলে মন্দ কাজে তুমি ভালো ফল পাচ্ছো, এর মানে এই নয় মন্দ ভালো ফল দেয়। তুমি ক্ষমতাবান বলে বস্তু জগতের প্রাণী ও মানুষ যেমন তোমাকে ভয় পায় তেমনি ‘মন্দও’ তোমাকে ভয় পায়। কাছে ঘেষতে চায় না। তাই বলে তোমার সৃষ্ট মন্দ কিন্তু ধ্বংস হয়ে যায় না। সে তোমার জীবনে মন্দ আনবেই। অনাদীকাল পর্যন্ত এমনকি তোমার মৃত্যুও পরও সে মন্দ বেঁচে থাকে। মন্দের মন্দ ফল তুমি পাবেই। অথবা আজ তুমি দুর্বল বলে ভাল কাজ করেও মন্দ ফল পাচ্ছো, এর মানে এই নয় যে ভালোর ফল তুমি পাবে না। আজ হোক কাল হোক ভালোর ফল তুমি পাবেই। কারণ তোমার সৃষ্ট ‘ভালো’র মৃত্যু নাই। সেও অনাদীকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে এমনকি তোমার মৃত্যুর পরও। সে ভালোর ভালো ফল তুমি পাবেই পাবে। ভালো ও মন্দ হচ্ছে গুণ, বস্তু আকৃতিগত দিক দিয়ে নানা রঙের হলেও দৃশ্য বা অদৃশ্য কোন বস্তুর গুণ পরিবর্তন হয় না। 
মিষ্টির উৎস বিভিন্ন হতে পারে, সেই উৎস বস্তুর পরিবর্তন বা বিবর্তন সাধিত হতে পারে কিন্তু তার যে জাত সত্ত্বা মিষ্টত্ব, এর পরিবর্তন হয় না। ভালো ও মন্দ দুটি পৃথক সত্ত্বা। কোন বস্তু, বিষয় বা মানুষের উপর আমরা ভালো বা মন্দ সত্ত্বা আরোপ করি। মানুষ নিজে ভালো বা মন্দ নয়। তবে টেলিভিশন বা এই ধরণের বস্তু তৈরির সময় নির্মাতা ইন-বিল্ট হিসেবে এর মধ্যে ’ভালো’ ঢুকিয়ে দেন। ভালো গুণটি দুর্বল বা নষ্ট হলে মন্দ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং টেলিভিশনটি নষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহও মানুষসহ সবপ্রাণীর মধ্যে ইন-বিল্ট হিসেবে ‘ভালো’ ঢুকিয়ে দিয়েছেন। খারাপ উপাদানে ভরা সংস্কৃতিগুলো সেই ভালোকে শুধু নষ্ট করে ফেলে তা নয় মানুষের মনুষ্যত্বকে পঙ্গু করে ফেলে, মানুষের সুবিচারবোধ, ন্যায়-অন্যায়বোধ কেড়ে নেয়, নিজের ও নিজেদের প্রতি এক ঘৃণিত ভালোবাসার জন্ম দেয় যা অন্যের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধকে লুপ্ত করে ফেলে। অথচ অন্যের প্রতি ভালোবাসাই মানুষকে মানুষ হিসেবে উন্নীত করে।
এখন প্রশ্ন হলো ভালো ও মন্দের মাপকাঠি কি! অথবা ভিত্তি কি! যা তোমার ভালো মনে হয় তাই-ই কি ভালো? অথবা তোমার গুরুজন যা কিছুকে ভালো বলেন তাই কি ভালো? অথবা বহুলোক বলছে এটি ভালো, অথবা খুব জ্ঞানী-পন্ডিত কোন ব্যক্তি বা দার্শনিক বলছেন এটি ভালো, তা-ই কি ভালো? মনে রাখতে হবে সূর্যকে সবাই সূর্য বলে, লাল রঙকে সবাই লাল রঙ বলে কিন্তু একটি ‘ন্যায়কে’ সবাই ন্যায় বলে না। একটি ‘সত্যকে’ সবাই সত্য বলে না।
একটি ‘উচিৎকে’ সবাই উচিৎ বলেনা। তাহলে? এসবের সহজ ও সরল উত্তর হলো : যিনি সূর্য, লাল রঙ, ন্যায় এবং উচিতের স্রষ্টা তাঁরই মতামতকে নির্দ্বিধায় মেনে নেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু তিনি উপর থেকে মাইক দিয়ে বলবেন না যে কিসে ন্যায় বা কোন বিষয়টি উচিৎ। সেটা বিজ্ঞানের পরিপন্থী। অথচ তিনি বিজ্ঞানময়। নীলাকাশ থেকে বৃষ্টি পড়া বিজ্ঞান ভিত্তিক নয়। সূর্যের কীরণে পানি বাষ্প হবে, বাতাসে ভেসে ভেসে তা আকাশে উঠবে, একত্রিত হয়ে তুলোর মত দল বেধে ভাসবে, তাতে একসময় কালো রঙ ধরবে তারপর ঠান্ডা বাতাস লেগে ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়বে। এটাই বিজ্ঞানভিত্তিক এই কারণে যে এতে চিন্তা-গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। মহান স্রষ্টা আল্লাহ এটাই চান যে মানুষ তার সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করুক। এতে মানুষের জ্ঞান বাড়বে, সে স্রষ্টার মহত্ত্ব বুঝতে চেষ্টা করবে। 
আল্লাহ নিজেই তাঁর পবিত্র কোরআনে বলেছেন,‘ ইন্না ফি খলকিছ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বী, ওয়াখতিলা ফিল লাইলী ওন্নাহারি লায়াতিল লিউলিল আলবাব; আল্লাজীনা ইয়াজকুরুনাল্লাহা ক্বিয়ামাও ওয়া কুউদাও ওয়ালা জুনুবিহিম ওয়াতাফাক্কারুনা ফি খলকিছসামাওয়াতি অল আরদ্। রব্বানা মা খালাকতা হাজা বাতিলা।”সূরা আল বাকারা: আয়াত-১৯০-১৯১, অর্থ: আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির ব্যাপারে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে সেইসব বুদ্ধিমান লোকের জন্য অসংখ্যা নিদর্শন রহিয়াছে, যাহারা উঠিতে বসিতে ও শুইতে সকল অবস্থায়ই আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি ও সংগঠন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে। তাহারা স্বত:স্ফূর্তভাবে বলিয়া ওঠে, আমাদের রব! এইসব কিছু তুমি অনর্থক ও উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করো নাই।…”।
অতএব ভালো-মন্দ বিচারের ভিত্তি হলো আল কোরআন এবং আল কোরআন যার মাধ্যমে এসেছে সেই মহানবী, শেষ নবী এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ হযরত মুহম্মদ স:-এর সুন্নতে রসূল তথা হাদিস সমূহ। মহানবী স:-এর সাংস্কৃতিক মানদন্ড কি ছিল! একটি মানুষের সাংস্কৃতিক উপাদান এবং উপকরণ গুলো অন্যের জন্য। একজন কারিগর প্লাষ্টিক দিয়ে যে খেলনা বানায় তা অন্যের জন্য। কারিগর একজন শিল্পী। শিল্পী যা করে তা অন্যের জন্য করে। কিন্তু এগুলো বৈষয়িক সংস্কৃতি। মানুষের মনকে যা রঞ্জিত করে তাই মানসিক সংস্কৃতি। সঙ্গীত, কবিতা, সাহিত্য, চিত্রকলা, অভিনয়, নাটক, চলচ্চিত্র এসবই মানসিক সংস্কৃতির বিষয়। কাজগুলো বড় গুরত্বপূর্ণ। মানুষের অন্তর্লোকের সৎ-প্রবৃত্তিকে শক্তিশালী করা অথবা মন্দ-প্রবৃত্তিকে শক্তিশালী করা এই সংস্কৃতির উদ্দেশ্য। এর পরবর্তী পদক্ষেপে মানুষ বৈষয়িক সাংস্কৃতিক কর্মে লিপ্ত হয়। এখন মানসিক সংস্কৃতির ভালো-মন্দের ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করা যাক:
এক্ষেত্রে দু’একটা উদাহরণের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। যেমন: তুমি একটা অর্ধ-উলঙ্গ যুবতীকে নায়িকা করে নায়ক সেজেছো, নাচছো, গাইছো জড়িয়ে ধরছো… যুবতী তোমার কোন আত্মীয় নয়। আচ্ছা ধরা যাক যুবতীটি তোমারই স্ত্রী, কন্যা অথবা বোন, তুমি কি পছন্দ করবে সেও অন্য নায়কের সাথে অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে নাচুক বা জড়িয়ে ধরুক! যতই এটা অভিনয় হোক তুমি কখনোই তা পছন্দ করবে না। আবার অন্যদিক দিয়ে ভাবা যাক, যেমন: বেয়াদবীর কারণে একটি ছেলেকে তুমি থাপ্পড় দিলে, এখন তোমার বেয়াদবীর কারণে তোমার চেয়ে শক্তিশালী কেউ যদি তোমাকে থাপ্পড় দেয়, তুমি সেটাকে উচিৎ না অনুচিত বলবে? এসব ক্ষেত্রে এসবের পক্ষে যত যুক্তি এসেছে তাতে দেখা যায় সম্মান, অর্থ, ক্ষমতাশালীর মত কতকগুলি শব্দের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলেছে এবং আজো চলছে। অন্যদিকে গালভরা বুলি, ‘একটি অপরাধের কারণে একজন সাধারণ মানুষের যে শাস্তি হবে একজন প্রধানমন্ত্রীরও একই শাস্তি হবে এবং এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে উনন্ত গণতন্ত্র।” কিন্তু বাস্তবে তা হয়না। এই সংস্কৃতিই দেশে, সমাজে এবং সমগ্র পৃথিবীতে একটা অরাজকতা সৃষ্টি করে চলেছে। শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা নাটক, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা এবং সকল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সেই সাক্ষ্যই বহন করে।
অতএব ভালো এবং মন্দের মাপকাঠি অথবা ভিত্তি হিসেবে আমরা নিশ্চিন্তে ও পরম বিশ্বাসে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম উন্নত সংস্কৃতির জনক হযরত মুহম্মদ স:-এর সংস্কৃতিই গ্রহণ করতে পারি এবং তা হলো: ‘ভালো তাই যা তুমি নিজের জন্য ভালো মনে করো তা অন্যের জন্যও ভালো মনে করো।’ আর মন্দ তাই ‘যা অন্যের জন্য মন্দ মনে করো তা নিজের জন্যও মন্দ।’ সুস্থ সংস্কৃতির মৌলিক তত্ত্ব এখানেই। ১৪০০শত পরে এসে দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেল মহানবী স:-এর বাণীকে এইভাবে ব্যক্ত করেছেন, ’নিজেকে অন্যের মাঝে অনুভব এবং অন্যকে নিজের মধ্যে অনুভব করার নাম সংস্কৃতি।’ এই তত্ত্বের ভিত্তিই শুধু মঞ্চ বা সিনেমা টিভির পর্দা নয় বরং পরিবার সমাজ দেশ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সুস্থতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

শেখ আবুল কাসেম মিঠুন